ওসমানী হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্ণারে ১৩ জন রোগী, নেই ডেঙ্গু টেস্টের সব ব্যবস্থা

প্রকাশিত: ৬:১২ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০১৯

ওসমানী হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্ণারে ১৩ জন রোগী, নেই ডেঙ্গু টেস্টের সব ব্যবস্থা

সিলেট ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন এই পর্যন্ত ১৩ জন। এই ১৩ জনই সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নারে চিকিৎসাধীন আছেন। এছাড়া বহিরাগত বিভাগে আরও অনেক ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য ওসমানী মেডিকেলে করা হয়েছে ডেঙ্গু কর্নার। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে একটি টিম গঠন করা হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য।

রোববার ডেঙ্গু কর্নারে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ডেঙ্গু রোগীদের এ, বি, সি ৩ ক্যাটাগরি করা হয়। এ ক্যাটাগরি মানে কম আক্রান্ত আর সি ক্যাটাগরির রোগীরা বেশি আক্রান্ত থাকেন। সি ক্যটাগরির রোগীদের মৃত্যুর সম্ভাবনাও থাকে। তবে সিলেটে যে ডেঙ্গু রোগী আছেন তারা সবাই এ ক্যাটাগরির বলে জানান ডেঙ্গু কর্নারে কর্তব্যরত চিকিৎসক। তাঁরা আরো জানান, ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তদের এন্টি বডি টেস্ট ও এন্টিজেন টেস্ট ওসমানী মেডিকেলে করার ব্যবস্থা নেই। এইগুলো বাইরের হাসপাতাল থেকে করানো হয়। বাকী অন্যান্য টেস্ট এখানে করা যায়।

রোববার দুপুরে দেখা যায় ওসমানী মেডিকেলের পুরাতন ভবনের নিচ তলায় ২৭ নং ওয়ার্ডে মেডিসিন পুরুষ বিভাগের ভিতরে ডেঙ্গু কর্নারে ভর্তি আছেন ১৩ জন রোগী। সকলকে রাখা হয়েছে মশারির নিচে।
রোগী ও তাদের স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা সবাই কোনো না কোনো কারণে ঢাকা গিয়ে ডেঙ্গু রোগে আক্রন্ত হয়েছেন।

ডেঙ্গু কর্নারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রোগীরা হলেন- শান্ত, রুকন, রাজকুমার, মাছুম, সোহেল, ইমরান আহমদ, রুবেল, রায়হান মিয়া, আশিক মিয়া, দেলোয়ার হোসেন, মস্তাকিম, জুবায়ে আাহমদ ও জয়নাল।
এদের মধ্যে রুবেল রায় নগরের মেন্দিবাগ এলাকার বাসিন্ধা তিনি চাকুরির ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য ঢাকা গিয়েছিলেন গত সপ্তাহে। সিলেট আসার পর থেকেই জ্বর, বমি ও মাথাব্যাথা শুরু হয় তার। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন রুবেল। ডেঙ্গু পরীক্ষাও করান। টেস্ট পজেটিভ আসার পর গত শনিবার সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি।
কেবল রুবেলই নন, এভাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ১২ জন রোগী। ফলে এ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য খোলা হয়েছে আলাদা কর্ণার।

সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্র সুনামগঞ্জের আব্দুল্লাহ আল মাসুম (২০)। ঢাকায় অবস্থান করার সময় তার জ্বর উঠে। তখন টেস্টে ডেঙ্গু ধরা পরে। সেখান থেকে সুনামগঞ্জে চলে আসেন মাসুম। পরে তার পরিবারের সদস্যরা গত বৃহস্পতিবার তাকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করান।

একই দিনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর চা বাগানের রাজ কুমার (১৮) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ওসমানী মেডিকেলে ভর্তি হন। ঢাকায় একটি কোম্পানিতে চাকুরি করতেন রাজকুমার। ঢাকাতে থাকা অবস্থায়ই তার জ্বর উঠে। সেখান থেকে তিনি জ্বর নিয়ে বাড়িতে চলে আসেন। মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে যান চিকিৎসা নিতে। কিন্তু সেখানে ডেঙ্গুর চিকিৎসা না থাকায় তাকে ওসমানী মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।

গত বুধবার জ্বর আর বমি নিয়ে ওসমানী মেডিকেলে ভর্তি হন এয়াপোর্ট এলাকার টিলাপাড়া গ্রামের ইমরান আহমেদ (২১)। টেস্ট করানোর পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে তার। ইমরান সিলেট দক্ষিণ সুরমা কলেজের অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্র।

২৫ জুলাই ওসমানী মেডিকেলে ভর্তি হন হবিগঞ্জের মো. সোহেল (৩২)। তিনিও গত সপ্তাহে ঢাকা গিয়েছিলেন শশুড় বাড়িতে। সেখান থেকে ফেরার পরই জ্বর উঠে সোহেলের। জ্বর নিয়ে মেডিকেলে ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি ডেঙ্গু সন্দেহভাজন হিসেবে চিকিৎসাধীন আছেন।

একই দিনে মেডিকেলে ভর্তি হন মৌলভীবাজারের রুপম দেব (২৩)। তিনি ঢাকায় চাকুরি করেন। ঢাকা থাকার অবস্থায় ৪দিন জ্বর ছিল তার। জ্বর নিয়ে ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার আসেন। সেখান থেকে ওসমানী মেডিকেলে এসে ভর্তি হন। কয়েকটি টেস্টেও রিপোর্ট নেগেটিভ আসলেও তিনি বর্তমানে ডেঙ্গু সন্দেহভাজন হিসেবে চিকিৎসাধীন আছেন।

সন্দেহভাজন ডেঙ্গু রোগী হিসেবে ওসমানী মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন আছেন মৌলভীবাজারের আইনুননবী শান্ত (১৭)। তিনি ভার্সিটি কোচিংয়ের জন্য ঢাকা গিয়েছিলেন। সেখানই জ্বর উঠে তার। জ্বর নিয়ে বাড়ি চলে আসেন শান্ত। বাড়ি আসার পর গত ২৫ জুলাই তার পরিবারের লোকজন তাকে ওসমানী মেডিকেলে ভর্তি করান। অন্যান্য ডেঙ্গু রোগীরাও এভাবেই রোগে আক্রান্ত হয়ে মেডিকেলে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

এদিকে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ ডেঙ্গুর সব টেস্ট ওসমানী মেডিকেলে হয় না। কিছু টেস্ট প্রাইভেট ক্লিনিক থেকে করা লাগে। ওই টেস্টগুলো করাতে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা খরচ হয়। ডেঙ্গু কর্ণারে বেশীর ভাগ রোগীর স্বজনদের অভিযোগ কর্তব্যরত নার্সদের বিরুদ্ধে। নার্সরা রোগীদের মেডিসিন নিয়মিত দিচ্ছে না। মেডিসিন দেওয়ার সময় পেরিয়ে গেলেও নার্সরা কোন গুরুত্ব না মোবাইল নিয়ে বসে থাকে।

এখানে চিকিৎসাধীন আইনুন নবী শান্তর মামা আবুবক্কর জিপু বলেন, ঢাকা যাওয়ার পরই আমার ভাগনের জ্বর উঠে। এখন ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রার্দুভাব বেশি। তাই শান্তকে ঢাকা থেকে এনে ওসমানী মেডিকেলে ভর্তি করাই। অনেক টেস্ট করা হয়েছে। কিছু টেস্ট এখানে করা হচ্ছে আর কিছু টেস্ট বাইরে প্রাইভেট হাসপাতালে করিয়েছি। ডেঙ্গুর সব টেস্ট এখানে হয় না। বাইরে যে ২টি টেস্ট করানো হয় সেগুলোর অনেক দাম রাখে প্রাইভেট হসপিটালের লোকজন।

আরেক রোগীর স্বজন নিয়ামত কাজী বলেন, ‘সরকারী হাসপাতালে সব থাকে না। শুনলাম ডেঙ্গু টেস্ট সরকারি হাসপাতালে ফ্রি করা হবে কিন্তু সরকারি হাসপাতালেতো টেস্টই হয় না। আমরা ডেঙ্গু টেস্ট বাইরে প্রাইভেট হাসপাতাল থেইক্কা করাইছি।’

এ ব্যাপারে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য ডা. শিশির রঞ্জন চক্রবর্তীকে প্রধান করে ইতোমধ্যে আমার একটি কমিটি গঠন করেছি। হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নার করা হয়েছে। বেশ কয়েকজন রোগী ভর্তি আছেন। যদি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় তাহলে সেবা দেওয়ার মত প্রস্তুতি আছে আমাদের।

রোগীদের ডেঙ্গু টেস্ট সম্পর্কে তিনি বলেন, ওসমানীতে ডেঙ্গুর সব টেস্ট হয় না। ডেঙ্গুর কিছু টেস্ট এখানে করা যায়। বাকি টেস্টগুলো করার মত যন্ত্রপাতি নেই আমাদের কাছে। সেজন্য বাইরে থেকে কয়েকটি টেস্ট করানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে প্রয়োজন সচেতনতা। আমার ইতোমধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও শুরু করেছি।
সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নুরে আলম শামীম বলেন, অন্যান্য স্থানে ডেঙ্গু রোগীর পরিমান যেভাবে বাড়ছে সিলেটে সেই আশঙ্কা নেই। কারণ সিলেটে এখনো ডেঙ্গুর লাভা পাওয়া যায়নি। সিলেটের সবগুলো উপজেলাতে আমরা খোঁজ খবর রাখছি। এখনো কোনো উপজেলাতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলেনি। ডেঙ্গু আক্রান্তদের জন্য ওসমানী মেডিকেলে ইতোমধ্যে ৮ বেড বিশিষ্ট একটি ডেঙ্গু কর্নার করা হয়েছে। সেখানে কিছু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানতে পেরেছি।
নুরে আলম শামীম আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেনতার কোনো বিকল্প নেই। আপনার বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখুন। রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন। এসব করলে সিলেটে ডেঙ্গু বড় ধরনের কোনো আঘাত আনতে পারবে না।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..