সিলেট ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা শাওয়াল, ১৪৪৬ হিজরি
প্রকাশিত: ১১:৫২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৬, ২০২০
সারা পৃথিবী আজ অদৃশ্য যুদ্ধের সাথে প্রতিনিয়ত লড়ছে, দেশে দেশে আজ লাশের মিছিল চলছেই, কেউই পারছেনা আটকাতে মৃত্যুর মিছিল। এযেন যুদ্ধকালীন সময়ের মত এক অন্ধকার, বিভীষিকাময় সময় পার করছে মানবসভ্যতা। পরমাণু আর আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাত ছাড়াই মানুষ মৃত্যুর মিছিলে যোগ দিচ্ছে। বিশ্বের বড় বড় পরমাণু আর অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশ সমূহ কভিড-১৯, করোনা ভাইরাস এর কাছে পুরোপুরি ধরাশয়ী হয়ে পড়েছে।
করোনায় বিশ্বে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজার ছাড়িয়েছে (আপডেটঃ ১৬ এপ্রিল রাত নয়টা পর্যন্ত)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোন যুদ্ধ ছাড়াই প্রাণহানি ঘটেছে পৃথিবীর এত এত মানুষের। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী এবং মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে, লাফিয়ে বাড়ছে। কুড়ি দিন বেশি সময় ধরে দেশ লকডাউনে থাকা অসহায়-দরিদ্র মানুষের জন্য সরকার খাদ্য সামগ্রী বিতরণ এর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে লিখতে হচ্ছে, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে কথাগুলো ভাবতেই। সরকারের দেয়া ত্রাণে পড়েছে শকুনের দলের থাবা। চাল চোরদের কথা লিখবার আগে মনে পড়ে গেল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর দানশীলতা আর মহানুভবতার কথা।
গ্রাম থেকে বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসে তাঁর এক ভক্ত নিজের ক্ষেতের কিছু সবজি উপহার হিসেবে দেয়ার জন্য বাসায় আসলে ওইখানে কর্তব্যরত এক ব্যক্তি সবজিগুলো নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে দিলে তিনি তাঁর ওই ভক্তকে দেয়ার জন্য ১০০টাকা দেন। ওই ব্যক্তিটি দোতলা থেকে নামার সময় ৫০টাকা রেখে বাকি ৫০টাকা বঙ্গবন্ধুর ওই ভক্তকে দেন। বঙ্গবন্ধুর প্রেরিত টাকা দেখে তিনি হতচকিত হয়ে পড়েন। তিনি কৌশলে বঙ্গবন্ধুর বাসার দোতলায় উঠে বঙ্গবন্ধুকে বলেন আমি তো টাকার জন্য সবজি দেইনি আপনাকে, আমার ক্ষেতের সবজি ভালবেসে আপনার জন্য এনেছি। আপনার ৫০টাকা ফেরত নেন। বঙ্গবন্ধু ৫০ টাকা দেখে হতবাক হয়ে যান, তিনি লোকটিকে বলেন আমি তো ১০০টাকা দিয়েছি, লোকটি বঙ্গবন্ধুকে বলেন আমি যার হাতে সবজি দিয়েছিলাম উনি পঞ্চাশ টাকাই দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর আর বুঝতে বাকি রইলনা, তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দোতলা থেকে নিচতলায় নামতেই যদি টাকা অর্ধেক হয়ে যায়। তাহলে আমার জনগণ কি পাবে? আমার চারিদিকে চোর- লুটেরায় ভরে গেছে, কিভাবে এদেশের মানুষের জীবন-মান উন্নয়ন করব?
প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে তাঁর বাবার মতই কিছু চোর-লুটেরাদের বেষ্টনীতে পড়ে গেছেন। তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এদেশের মানুষের জীবন-মান উন্নয়নের লক্ষে কিন্তু কিছু চোরদের কারনে তাঁর সকল কর্মকান্ড আর সফলতা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ায় কম্বল চোরেরা অন্তরায় হয়েছিল, ঠিক সেই রকমই শেখ হাসিনা’র আধুনিক সমৃদ্ধশালী ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে এসব চাল চোর অন্তরায় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এদেরকে শক্ত হাতে ধমন করার সময় এখনই, এদেরকে দ্রুত প্রতিহত করতে না পারলে সরকারের সফলতার গুড়ে বালি পড়বে।
বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষকে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হিসেবে গন্য করা হয়। যে দুর্ভিক্ষে মানব সভ্যতা চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত হয়েছিল। কয়েক লক্ষ মানুষ ওই দুর্ভিক্ষে খাদ্যের অভাবে মারা যান। সেই সময়ে ত্রাণ এর অপ্রতুলতার কারনে অভুক্ত মানুষেরা বলেছিল, ভাত দে নইলে মানচিত্র চিবিয়ে খাব।
আল্লাহ না করুন দেশে যে হারে ত্রাণ (চাল, তেল) চোর বেড়েছে তাতে যদি ত্রাণ এর সংকট দেখা দেয় তাহলে কিন্তু মানুষ চুয়াত্তর এর দুর্ভিক্ষের মত মানচিত্র চিবিয়ে খাইতে চাইবে। টিসিবির চাল-তেল নিয়েও চলছে মহা বাণিজ্য। স্বদেশের অবস্থা এমন একটা পর্যায়ে পৌছেছে, যে যেদিকে সুযোগ পাচ্ছে সেদিকেই লুটেপুটে খাচ্ছে।
এমন জনপ্রতিনিধির খবরও পাওয়া গেছে যার কাছে মানুষ ত্রাণ চাওয়ায় তাকে মারধর করে রক্তাক্ত করেছেন, কিছু চেয়ারম্যান-মেম্বার শারীরিক, মানসিক আর সামাজিকভাবে হেনস্তাও করেছেন অনেককেই। গরিবের হক/ নায্য অধিকার ত্রাণ নিয়ে ত্রাসবাজী চলছে। দেশের চারিদিকে শুধু গরিবের হক মেরে দেয়া চাল চোর আর তেল চোরদের সংবাদই শুনি। এসব ত্রাসকারীদের দেখার কেউ নেই! রুখারও কেউ নেই!
এ যেন শুটকির ভাগাড়ে বিড়াল পাহারাদার। লুটেরা পাকিস্তানিদের কাছ থেকে পূর্বসূরিরা যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন তা আজ পদতলে ভূলন্ঠিত হয়েছে। তাহলে মুক্তিযোদ্ধারা এত কষ্ট করে কেন শোষণ-বঞ্চনা আর লুটেরা পাকিস্তানিদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করলেন? ফের যদি স্বজাতি ভাইদের কাছ থেকে অধিকার বঞ্চিত হন সাধারণ মানুষ। গরিব মানুষের মুখের আহার গ্রাস করে তারা আসলেই সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছে। সামাজিক আর অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরির জন্য এসব চাল চোররাই দায়ী। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এসব চাল চোর-তেল চোর পাকিস্তানি হানাদারদের বংশধর। তাহলে কি আমরা জনগণ ধরে নিব আওয়ামীলীগ তাদের দলের আদর্শ নেতা কর্মীদের মধ্যে প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হয়েছে নাকি লুটেরা হওয়ার দীক্ষা দিয়েছে?
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারি দল আওয়ামীলীগে হঠাৎ এত চাল চোর আমদানি হল কিভাবে? এরা কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আর শেখ হাসিনা’র রাজনৈতিক দর্শন এবং দীক্ষা একেবারেই ভুলে গেল? টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকার পরও কি তাদের অর্থাভাব যায়নি। কেন গরীব-মেহনতি মানুষের মুখের আহার কেড়ে নিবে এইসব দানবরা।
সরকারের কাছে জনসাধারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যামে দাবি করছেন যেভাবে সৌদি আরবের আইন দেখিয়ে/ উদাহরণ/দৃষ্টান্ত দেখিয়ে মসজিদে মুসল্লিদের যাতায়াত সীমিত করেছেন ঠিক সেভাবেই চাল চোর/ তেল চোরদের হাত কেটে দেয়ার জন্য। যদিও এই দাবি আমাদের দেশের প্রচলিত আইনের সাথে সাংঘর্ষিক কিন্তু জনসাধারণ যে কোন কিছুই বলতে পারেন তা মানা না মানা সরকারের বিষয়। তবে এই দাবি গণদাবিতে পরিণত হলে কিন্ত সরকারকে মানতেই হবে, তখন মানা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা।
আমরা এমন এক বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলছি, যেখানে এক শ্রেণির লোক, এরা শেয়ার বাজার লুটে পথে বসিয়ে দিয়েছে লাখো মানুষকে, এরা ব্যাংকের টাকা লুট করে নেয় নিজের টাকা মনে করে, এরা ব্যাংকের লকারে রক্ষিত সোনাও লুট করে ফেলেছে নির্বিবাদে। এরাই দরিদ্র-অসহায়, কর্মহীন মানুষের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত চাল, ডাল, তেল দেদারসে চোরি করছে আর নিজেদের আখের গোছাচ্ছে।
সরকারি এসব কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িতদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারাটাই আজকের এই দুরবস্থার অন্যতম কারণ। আর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারার ব্যর্থতার জন্য দায়ী অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো। রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলেন, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিতে না পারার কারনেই দেশে চোর পালন হচ্ছে বেশী।
ত্রাণ সামগ্রী হচ্ছে গরিব মানুষের হক, এই হক যারা মেরে খাবে, চোরি করে খাবে তারা ইসলামের চোখে জঘন্যতম অপরাধী। নবী করিম (সা.) এর ভাষ্যমতে, কেয়ামতের দিন অনেক মানুষ পাহাড় পরিমাণ নেক আমল নিয়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে কিন্তু দুনিয়াতে থাকা অবস্থায় যাদের হক নষ্ট করেছে (গরিব মানুষের চাল, তেল চোরি করে খেয়েছে) তারা আল্লাহ এর কাছে বিচার প্রার্থী হলে ওই ব্যক্তির নেক আমল অভিযোগকারীদের দেয়া হবে। এক পর্যায়ে তার নেক আমল শেষ হয়ে গেলে অভিযোগকারীদের গুনাহগুলো তাকে দেয়া হবে যার ফলে সে হবে জাহান্নাম এর বাসিন্দা ।
আল্লাহর রাসুল এই ধরনের লোককে সবচেয়ে বড় অভাবী, বড়ই হতভাগা, বড় ভিখারি হিসেবে অবিহিত করেছেন। কেননা সে অনেক নেক আমল নিয়ে এসেও জাহান্নামি হয়েছে। যারা ত্রাণ সামগ্রী চোরি করবে, রাষ্ট্রের সম্পদ আত্মসাৎ করবে, বিশেষ করে যারা জনগণের হক মেরে খাবে, গরীব-অসহায় মানুষের পেটে লাথি মারবে এইসব মানুষের পরিনতি কেয়ামতের দিন ভয়াবহ হবে। আল্লাহ যেন এসব ত্রাণ চোরদের হেদায়েত দান করেন। চাল-তেল চোরদের উদ্দেশ্যে বলি, আপনার সন্তানেরা কি নিয়ে বড় হচ্ছে, তাদের বাবার এত ধন-সম্পত্তি থাকার পরও যেন তারা কোথাও গরিব কেননা তাদের বাবা অসৎ। এত কিছু থাকার পরও তারা গর্বহীন হয়ে পড়েছে। সৎ হবার গর্ব, একজন সৎ বাঙালি হবার গর্ব থেকে আপনার সন্তানদের আর বঞ্চিত করবেন না।
যে, জনসাধারণের মুখের আহার নিয়ে লুটতরাজ চালাচ্ছেন, তারা কিন্তু জাগতে শুরু করেছে, ইতিমধ্যে অনেক জায়গায় চাল চোরদের শাস্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। অনেক চেয়ারম্যান, মেম্বার জনতার দৌড়ানি খেয়েছেন। এই দেশের প্রত্যেকটি মানুষ এক একটি ঘুমন্ত বাঘ, তাদের মুখের আহার কেড়ে নিলে তারাও কিন্তু একদিন সামনের দিকে হিট করা শুরু করবে, তখন আর পালানোর সময় পাবেন না কেননা চারিদিকেই দেখবেন জনসমুদ্র। ত্রাণ নিয়ে ত্রাস বন্ধ করুন নইলে কিন্তু জনগণও সময়মত আপনাকে লাল কার্ড দেখিয়ে দিবে। পরিশেষে এই কথা বলেই আজকের মত শেষ করছি সাধু সাবধান। আল্লাহ হাফেজ।
লেখকঃ সালেহ আহমদ হোসাইন
সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
১৬ই এপ্রিল ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
Sharing is caring!
………………………..
Design and developed by best-bd