সিলেট নগরের জন্ম তখন থেকেই সিলেটবাসীর কাছ থেকে পেয়েছেন নগরপিতার পরিচয়টি। এরপর দশ বছর নগরপিতার আসনে বসে সিলেট সিটি করপোরেশনের মানুষের সাথে ছিলেন।
নগরের সেবা করার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব ছাড়ার পরও মানুষের সুখে-দুঃখের সাথী ছিলেন তিনি। তাই হয়ত মানুষের কাছে ‘সাবেক’ হননি। নামের পাশে থেকে যায় ‘মেয়র কামরান’।
সেই সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য বদর উদ্দিন আহমদ কামরান সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন। রোববার দিবাগত রাত ৩টার দিকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র।
করোনাভাইরাসের কাছে হার মেনে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের টানা ১৭ বছরের এই সভাপতির চলে যাওয়াটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছে না সিলেটবাসী।
জানা যায়, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের হাত ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন সিলেট নগরীর ছড়ারপারের বাসিন্দা বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। ছাত্র অবস্থাতেই কামরান ১৯৬৮-৬৯ এর উত্তাল সময়ে মিছিল যাওয়ার শুরু করেন। উচ্চ মাধ্যমিকে পড়া অবস্থাতেই ১৯৭৩ সালে কামরান সিলেট পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হন। সেই থেকে রাজনীতির মাঠে পথচলা। ১৯৭৭ সালে আবার কমিশনার নির্বাচিত হন। একের পর এক সাফল্যের হাত ধরে ১৯৯৫ সালে তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর মানুষের আস্থার প্রতিদান দিয়ে জনপ্রতিনিধির অগ্নিপরীক্ষায় বরাবরই উতরে গেছেন তিনি।
২০০২ সালে যখন সিলেট পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়, তখন ‘বিলুপ্ত’ পৌরসভার চেয়ারম্যান বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে নবগঠিত সিলেট সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র করা হয়। এরপর ২০০৩ সালের ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে কারাগারে থেকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেন। সেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীর চেয়ে ৮৫ হাজার ভোট বেশি পেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন কামরান।
২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে প্রায় ৩৫ হাজর ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন তিনি। এর আগে পর্যন্ত কখনো কমিশনার, দুই দফা পৌরসভার চেয়ারম্যান ও ২ দফা সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন কামরান। ২০১৮ সালের সিটি নির্বাচন ছিল তাঁর জীবনের সর্বশেষ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি তিনি।
২০০৪ সালের ৭ আগস্ট সন্ধ্যায় সিলেট নগরীর তালতলাস্থ গুলশান সেন্টারে গ্রেনেড হামলায় আল্লাহর অশেষ করুনায় বেঁচে গিয়েছিলেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। অনেকের সাথে সে দিন আহত হয়েছিলেন তিনি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইব্রাহিম মারা যান। সেই দুর্বিষহ স্মৃতি মনে করে বিভিন্ন সভা সমাবেশে চোখের জল ফেলে কাঁদতেন কামরান।
রাজনৈতিক জীবনে বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ছিলেন সিলেট মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি। বিভিন্ন সময়ে তিনি শহর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন কামরান।
আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত স্নেহ করতেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান কে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর শেখ হাসিনাই কামরানকে বিমান বাহিনীর এয়ার এম্বুলেন্স করে ঢাকার সিএমএইচে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। সিলেট নগরীতে জনতার কামরান হিসেবে পরিচিতি ছিল তাঁর।
তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এসময় পরিবারের সবাইকে ধৈর্য ধরতে আহ্বান জানান তিনি।