সিলেট ৬ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ৭ই শাওয়াল, ১৪৪৬ হিজরি
প্রকাশিত: ১১:৫৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২০, ২০২২
নিজস্ব প্রতিবেদক :: ভূমির স্থিতিশীলতা রক্ষায় ও ভূ-কম্পনরোধে পাহাড়টিলার বিকল্প নেই। এটাই ভূ-তত্ববিধদের ঐক্যমত। বিধায় পরিবেশ ও পতিবেশের বিপর্যয় টেকাতে পাহাড়-টিলা কর্তন নিষিদ্ধ সব দেশেই নিষিদ্ধ। তাই ভূমিকম্প প্রবন সিলেট নগর ও সিলেট জেলার পাহাড় টিলা রক্ষার্থে পাহাড়টিলা কর্তন বন্ধ করতে হবে। কিন্তু সে কর্তব্য পালন করছে না রাষ্ট্রের সংশ্রিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাগুলো। আর এ কারণে সিলেটে অবাধে পাহাড় টিলা কর্তন ও সাবাড় করে সমতল ভূমিতে পরিণত করার প্রবনতা অব্যাহত রয়েছে। ফলে ঘনঘন ভূ-কম্পন অনুভুত হচ্ছে সিলেটে।
গত বছরের মাঝামাঝিতে ১০ দিনের ব্যবধানে লাগাতার ১৫ বারের মত অধিক ভুকম্পন হয় সিলেট মহানগরসহ ও আশপাশ এলাকায়। ফলে প্রায় ১০ দিন বন্ধ রাখতে হয় নগরের বহুতল বাণিজ্যিক ভবন,বিপনীবিতান ও মার্কেটগুলো। পাহাড়-টিলা কর্তন ও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন করে যাচ্ছে ‘বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। বেলা’র এ আন্দোলনের মুখে সিলেটের বিভিন্ন পাথর কোয়ারি থেকে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ হলেও বন্ধ হয়নি পাহাড় টিলা কর্তন। তাই বাধ্য হয়েই বেলা ২০১১ সালে মহামান্য হাইকোর্টে মামলা করে। মামলায় সিলেট সিটি কর্পোরেশন,সিলেট সদর, গোয়াইনঘাট, বিয়ানীবাজার, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার বিদ্যমান পাহাড়-টিলা কর্তনে নিষেধাজ্ঞা প্রদানের আবেদন করা হয়। এ মামলার প্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ১ মার্চ মহামান্য হাইকোর্ট মামলা সংশ্লিষ্ট এলাকা সমুহের পাহাড়-টিলা রক্ষা ও কর্তন বন্ধ রার নিমিত্তে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্নিষ্টদের নির্দেশ দেন। উচ্চ আদালতের এ সুস্পষ্ট নির্দেশনার পরও সিলেট জেলার মামলাভুক্ত বিভিন্ন এলাকায় নির্বিচারে পাহাড়-টিলা কাটা হচ্ছে।
সম্প্রতি বেলার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সিলেটে সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) এলাকার আখালিয়া করের পাড়া, হাওলাদারপাড়া, বালুচর, তারাপুর, বাদামবাগিচা, জাহাঙ্গীরনগর,বনকলাপাড়া ও শাহি ঈদগাহ, সদর উপজেলার টিলাগড়, খাদিম বাগমারা, জালালাবাদ, এয়ারপোর্ট এলাকা, টুলটিকর, মেজরটিলা, শাহপরাণ ও বড়শালা, জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর, বারমাটি, ঠাকুরের মাটি, চিকনাগুল ও বাঘেরখাল, গোয়াবাড়ী ও কমলাবাড়ী এলাকা; গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ রামনগর; গোলাপগঞ্জ উপজেলার হেতিমগঞ্জ, ঘোষগাঁও, ঢাকা দক্ষিণ, রনকেলি, বাঘা ও ধারাবহর এলাকা এবং বিয়ানীবাজার উপজেলায় টিলা কাটা চলছে। অথচ দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। টুপাইসের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা পহাড় কর্তনের সুযোগ করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগে প্রকাশ।
উচ্চ আদালতের এ নির্দেশনা মোতাবেক সংশ্লিষ্টরা পহাড়টিলা কর্তন বন্ধে কার্যকরি ব্যবস্থা না নেওয়ায় গত বছরের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের সচিবসহ মামলা ও পরিবেশ রক্ষা সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও দপ্তরের ১৫ জনকে নোটিশ দেয় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। রেজিস্ট্রি ডাকযোগে তৎসময়ে নোটিশ প্রপ্তরা ছিলেন-সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তফা কামাল, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোস্তাফিজুর রহমান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার, সিলেটের তৎসময়ের বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিলুর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন, সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম, সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. নিশারুল আরিফ, পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. তাহমিনা আক্তার, গোয়াইনঘাটের ইউএনও তাহমিলুর রহমান, বিয়ানীবাজারের ইউএনও মো. আশিক নূর, কোম্পানীগঞ্জের ইউএনও সুমন আচার্য, জৈন্তাপুরের ইউএনও নুসরাত আজমেরী হক, গোলাপগঞ্জের ইউএনও মো. গোলাম কবির। বরাবর সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমেদ কবীর স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। বেলা’র নোটিশে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সিলেটের পাহাড়, টিলা কাটা ও পাহাড়ি বন উজাড় বন্ধ এবং পাহাড়ে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনা নির্মূল-উচ্ছেদে কঠোর, দ্রুত ও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ আদায় ও দোষীদের শাস্তির আওতায় এনে পাহাড়-টিলা কাটা মামলাভুক্ত এলাকায় দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে বনায়নের দাবিও জানানো হয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। আদালত অগ্রাহ্য করে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে আজোবধি চলমান রয়েছে পাহাড়টিলা কর্তন। কখনো দিন-দুপুরে আবার কখনো রাতের আঁধারে কেটে সাবাড় করা হচ্ছে পাহাড়-টিলা। সূত্রমতে সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন প্রকল্প, রাস্তাঘাট ও হাউজিংয়ে পাহাড় টিলা কর্তিত মাটি দিয়েই ভরাটের কাজ করা হচ্ছে। খাদকরা পরিবেশ অধিদপ্তরসহ প্রশাসন ও পুলিশকে ম্যানেজ করেই পাহাড় কর্তন ও মাটি বিক্রি অব্যাহত রেখেছে।
সিলেট নগরীর আখালিয়া করের পাড়া, জাহাঙ্গীর নগর টিলা, তারাপুর, বালুচর, এলাকায় পাহাড়-টিলা কেটে খাদকরা ট্রাক ও ট্রলি দিয়ে বালুমাটি ও লালমাটি বিক্রি করছে। পাশাপাশি কর্তিত স্থানগুলোতে হাইজিং প্লট তৈরি করে তা অধিকমূল্যে মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। জৈন্তাপুরের চিকনাগুল ও হরিপুর এলাকার বিভিন্ন টিলা কেটে সিলেট শহরতলী শাহপরাণ এলাকাস্থ বিভিন্ন হাউজিং ভেরাটে মাটি বিক্রি করছে খাদকরা। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিরা মাঝেমধ্যে আইওয়াশ অভিযান ও আইওয়াশ দু-একটি মামলা দিয়ে তদের পকেট আরো বেশি ভারী করা ছাড়া আর কোন কর্তব্য পালন করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
পাহাড়টিরা কর্তনের ফলে একদিকে যেমন সিলেটে ভুমিকম্পের ঝুকি বাড়ছে, তেমনি টিলার মাটি দিয়ে হাওর-বিল এলাকাস্থ হাউজিং-সহ সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন প্রকল্প ভরাটের কারণে নিম্নাঞ্চলে পানির ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে সিলেট অঞ্চলে বন্যার ভয়াবহতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব মিলিয়ে পাহাড় টিলা কর্তনের মাধ্যমে পুণ্যভূমি সিলেটের পরিবেশ ও প্রতিবেশকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে বিজ্ঞমহল মনে করছেন।
Sharing is caring!
………………………..
Design and developed by best-bd