সিলেট ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা শাওয়াল, ১৪৪৬ হিজরি
প্রকাশিত: ৪:২৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০২২
ক্রাইম সিলেট ডেস্ক : সিলেট বেতারের আধুনিকায়ন প্রকল্প এখনও আলোর মুখ দেখেনি। দুই বছরের প্রকল্প চার বছরেও শেষ না হওয়ায় সরকারি এই মাধ্যমটিকে গণমুখীকরণ সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে শুরু থেকেই কাজের মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
নিম্নমানের সরঞ্জাম ক্রয়, বাসের অযোগ্য ডরমেটরি ভবন, অডিটোরিয়াম ভবনে ফাটল, ভবনের ছাদ বেয়ে পানি পড়াসহ প্রকল্প অনুযায়ী কাজ যথাযথ হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিবরণসহ অনেক অনিয়ম তুলে ধরলেও বেতার সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি হননি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতিমধ্যে ৫৩ ভাগ অর্থ বরাদ্দের বিপরীতে কাজ হয়েছে শতকরা ৬৪ ভাগ। বর্তমানে ক্যাটাগড়ি চেঞ্জের প্রক্রিয়া চলছে। ফলে চলতি বছরেও কাজ শেষ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে বেতার কলাকুশলীরা বলছেন পিডি, ডিপিডি আর আঞ্চলিক প্রকৌশলী দুর্নীতিগ্রস্ত। ফলে কাজ হচ্ছে না ঠিকভাবে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারছে না সিলেট বেতার সংশ্লিষ্ট লোকজন।
বেতার মাধ্যমকে আরও আধুনিকায়ন ও গ্রহণযোগ্য করতে বেতার সিলেট আঞ্চলিক কেন্দ্রের জন্য অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্র আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল সম্প্রচার যন্ত্রপাতি স্থাপন প্রকল্পে আসে বরাদ্দ।
জানা যায়, সিলেট বেতারের জন্য গৃহিত প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ২২ মে একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয় ওই বছরের ৫ আগস্ট। ‘বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্র আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল সম্প্রচার যন্ত্রপাতি স্থাপন’-শীর্ষক এই প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ছিল ‘জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২০ পর্যন্ত । প্রকল্পের আওতায় গৃহিতব্য কার্যাবলীর মধ্যে ছিল ১০ কিলোওয়াট এফএম ট্রান্সমিটার স্থাপন, ২০ কিলোওয়াট এএম ট্রান্সমিটার স্থাপন, এমসিআর ও স্টুডিও যন্ত্রপাতি ক্রয়, ডিএসএনজি ক্রয়, ৪০০ ফুট সেফ সাপোর্টেড টাওয়ার (প্রচার ভবন), অডিটোরিয়াম নির্মাণ, ডরমেটরি ভবন নির্মাণ, কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র স্থাপন এবং বিভিন্ন মেরামত কাজ। শুরুতে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় সাড়ে ৫৬ কোটি (৫৬২২.৪৩ লক্ষ) টাকা । যা পরে ৮৭ কোটি বরাদ্দ হয়।
এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় দুই বছর অতিক্রম করেছে। প্রকল্পের অর্ধেক কোর সম্পন্ন হয়নি এখনও। এফ এম ও এএম ট্রান্সমিটার বসানো হলেও তা সম্প্রচারের আওতায় আনা এখনও সম্ভব হয়নি। যদিও ট্রান্সমিটার ক্রয়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর বিগত দিনে অনেক গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও কাজ হচ্ছে নিম্নমানের। কাজের গতিও ধীর। এই অবস্থায় চলমান প্রকল্প কবে নাগাদ বাস্তবায়ন শেষ হবে তাও রীতিমত ধোঁয়াশা!
বেতার সিলেটের আঞ্চলিক কেন্দ্র পরিদর্শন কালে দেখা গেছে অডিটোরিয়ামের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের পথে। এরই মধ্যে দেয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটল। গত বৃষ্টিতে অডিটোরিয়ামের ছাদ বেয়ে নেমে আসা পানি মেঝেতে জমে টাইলস উঠে গেছে অনেক জায়গায়। পরে তড়িঘরি করে আবার মেরামতও করা হয়েছে । অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের ফলে এমন অবস্থা তৈরি হচ্ছে।
নির্মাণকাজ চলছে ডরমেটরি ভবনের। যা কর্তা-কর্মচারীদের সাময়িক থাকার জায়গা। এই ভবনের কাজ প্রায় শেষের পথে। কিন্তু ডরমেটরি ভবন নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। এটা মানুষ থাকার ঘর না, ‘মুরগীর কুট্টি’ বলেও মন্তব্য করেছেন বেতারের একাধিক কর্মকর্তারা। প্রজেক্ট প্রোফাইলে আধুনিক ডরমেটরি নির্মণের কথা থাকলেও, নিম্নমানের টাইলসের প্রলেপ আর থাই গ্লাসের আবরণ ছাড়া আধুনিকতার কোনো ছোঁয়াই নেই ডরমেটরিতে। ।
এমসিআর ও স্টুডিও যন্ত্রপাতির কোনো খবর নেই এখনও। একে তো কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সিস্টেম বিকল, তার উপর জরাজীর্ণ স্টুডিওতে কোনো রকমে চলছে রেকর্ডিং ও প্রচারের কাজ। স্টুডিওর ভেতরে অনেক জায়গায় সিলিং পচে গেছে, টুকরো টুকরো হয়ে নিচে অনেকের গায়ে পড়ছে, যেকোনো সময় সিলিং ধসের আশঙ্কাও রয়েছে। কনসোল থাকলেও কেবল সংযোগ বিপদজনক অবস্থায় আছে। বিভিন্ন সংযোগ পয়েন্টে শট সার্কিট নিয়মিত ব্যাপার। বিদ্যুতের লোড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম জরাজীর্ণ। যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বিপর্যয় ।
প্রায় চার বছর ধরেই চলছে প্রজেক্টের কাজ। কাজের শুরুতেই নানা অনিয়মের কারণে বারবার সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয় বাংলাদেশ বেতার সিলেট। বিভাগীয় তদন্ত, মন্ত্রণালয়ের তদন্ত ইত্যাদির পর তৎকালীন আঞ্চলিক প্রকৌশলী মনোয়ার হোসেন খান অপরাধের বোঝা মাথায় নিয়ে বরখাস্ত হন। তাকে কোনো দায়িত্ব না দিয়ে ক্লোজড করে রাখা হয়। দীর্ঘদিন তার বেতন ভাতাও আটকে রেখেছিল মন্ত্রণালয়।
আঞ্চলিক প্রকৌশলীর নতুন দায়িত্ব পান আবুল হাসান মোহাম্মদ ফয়সল। তার বিরুদ্ধেও ছিল বিস্তর অভিযোগ। উপ আঞ্চলিক প্রকৌশলী থাকাকালীন ফয়সলের নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে শাস্তিমূলক বদলিও করা হয়। তার ফেসবুক আইডিতে স্ট্যাটাস দিয়ে সরকারের নানা বিষয়ে সমালোচনা করার অপরাধে তাকে সে সময় শোকজও করা হয়েছিল। তারপর নানা তদবির তিনিই আবার দায়িত্ব পান চলতি আঞ্চলিক প্রকৌশলীর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেতার সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, আধুনিকায়ন প্রকল্পের শুরুতেই এসি প্ল্যান্টের কাজ নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। তারপরও তড়িঘরি করে কাজ শেষ হলো। কিন্তু বিধিবাম! প্রায় ৮ কোটি টাকা খরচ করে নির্মিত এসি প্ল্যান্ট হস্তান্তরের আগেই বিকল! এফএম ও এএম ট্রান্সমিটার বসানো হলেও তা সম্প্রচারের আওতায় আনা এখনও সম্ভব হয়নি।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেটের সাধারণ সম্পাদক গৌতম চক্রবর্তী বলেন, ‘অভিযোগ শোনলেও আমাদের কিছু করার নেই। তবে কষ্ট হয় এই ভেবে যে, সরকার টাকা বরাদ্দ দেয় উন্নয়নের জন্য। কিছু সংখ্যক দুর্নীতিবাজদের জন্য তা সম্ভব হয়ে উঠে না।‘
বেতারের আঞ্চলিক প্রকৌশলী আবুল হাসান মোহাম্মদ ফয়সল বলেন, ‘প্রকল্পের বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি)। কারণ প্রকল্পাধীন কাজের এ টু জেড নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। নিজের উপর বিগত দিনের অভিযোগ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি সেটি এড়িয়ে বলেন, প্রকল্পের কাজ এখনও চলমান রয়েছে।‘
প্রকল্পের ধীরগতি স্বীকার করে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মুজিবুর রহমান বলেন, এক তৃতীয়াংশ কাজ হয়েছে-এই তথ্য সঠিক নয়।
ডরমেটরি ভবনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি কর্মকর্তাদের স্থায়ী আবাসিক ভবন নয়, সুতরাং ওয়ার্ক প্রোফাইল অনুযায়ী কাজ হচ্ছে।’ তিনি শতকরা ৫৩ ভাগ টাকার বিপরীতে ৬৪ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলেও জোর দাবি করেন।
সিলেট বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক আবদুল্লাহ তারেক বলেন, ‘পুরো প্রকল্পের কাজ এখনও অনেক বাকি। কাজ সম্পন্ন হলেই আমাদের হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সুতরাং কাজ শেষ হওয়ার আগে আমি কোনো মন্তব্য করতে রাজি নই’।
Sharing is caring!
………………………..
Design and developed by best-bd