অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা-টমটমে সয়লাব জালালাবাদ থানা এলাকা

প্রকাশিত: ৬:৩৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০২২

অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা-টমটমে সয়লাব জালালাবাদ থানা এলাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক :: রেজিস্ট্রেশন নেই মিটার নেই, রোড পারমিটও নেই, এমনকি বাণিজ্যিকভাবে চলার অনুমতিও নেই। এরকম হাজারো অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যটারি চালিত টমটম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসএমপি’র জালালাবাদ থানা এলাকাধীন উত্তর সিলেটের আঞ্চলিক সবকটি সড়ক। নিবন্ধন ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে চলছে অবৈধ সিএনজি চালিত অটোরিক্সা। এসব অটোরিক্সার পেছনে লেখা রয়েছে শুধু আবেদিত অথবা অনটেস্ট। মাস শেষে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে একটি পুলিশ টোকেন দিয়ে এগুলো চলার বৈধতা দিয়েছেন কিছু শ্রমিক নেতা আর থানা পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা। এছাড়া এসব অটোরিক্সার চালকদেরও নেই কোন লাইসেন্স। সমিতির সদস্য হলেই গাড়ি চালানো যায়, এতে তাদের কোন ভোগান্তি পোহাতে হয় না। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) জালালাবাদ থানা এলাকাধীন প্রায় ৮টি আঞ্চলিক সড়কে এভাবেই চলছে এসব অবৈধ সিএনজি চালিত অটোরিক্সা এবং ব্যাটারী চালিত টমটম। জালালাবাদ থানার ইসলামগঞ্জ বাজার ও শিবের বাজর থেকে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের সব কটি সড়কে সিএনটি অটোরিক্শার পাশাপাশি অবাধে চলে ব্যাটারী চালিত টমটম।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সিলেট সার্কেল অফিস সূত্র জানায়, ২০১৭ সাল পর্যন্ত সিলেটে বৈধ সিএনজি চালিত অটোরিক্সা রয়েছে ২১ হাজার ২৩২ টি। এর পর প্রায় ৫ বছর আগে দেড় হাজারের উপরে সিএনজি অটোরিক্সার নিবন্ধনের জন্য আবেদন জমা পড়ে। এসব আবেদনের কোন সুরাহা এখনো হয়নি। এছাড়া এর বাইরে কোনও আবেদন না করেই আরও কয়েকহাজার সিএনজি চালিত অটোরিক্সা সিলেটের বিভিন্ন সড়কে চলছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিলেট জেলা সিএনজি অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের ছত্রছায়ায় সিলেটে মেট্রোপলিটন সিটির উত্তর অংশের জালালাবাদ ইউনিয়ন এলাকাধীন কয়েকটি আঞ্চলিক সড়কে চলাচল করছে এসব অবৈধ অটোরিক্সা। পুলিশ, সমিতির নেতা, বিআরটিএ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশে একটি পুলিশ টোকেন নিয়েই চলছে এসব সিএনজি অটোরিক্সা। টোকেন দিয়েই অবৈধ অটোরিক্সাকে বৈধতা দেওয়ার বিনিময়ে তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিএনজি অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সংগঠনের কয়েকটি শাখা রয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটন জালালাবাদ ইউনিয়নের তেমুখী থেকে উত্তর অঞ্চলের কয়েকটি স্ট্যান্ডে। এগুলো হচ্ছে তেমুখী, টুকেরবাজার, বলাউড়া-বানাগাঁও, সোনতলা, বাদাঘাট, মোগলগাও, পিঠারগঞ্জ, ইসলামপুর বাজার, শিবের বাজারের উত্তর ও দক্ষিণ, উমাইরগাঁও, বাছাইপার বাজার প্রভৃতি। এসব শাখার অধীনে অবৈধ অটোরিক্সা রয়েছে কয়েক হাজার । প্রতিটি গাড়ির নম্বর প্লেট লেখা রয়েছে- ‘সিলেট-থ-১২-আবেদিত’ অথবা অনটেস্ট। প্রতিটি অটোরিক্সা থেকে প্রতি মাসে ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা করে আদায় করে পুলিশ টোকেন দেন অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা। ওই টোকেনে চলা যায় এক মাস। প্রতি মাসে টোকেন না নিলে সমস্যায় পড়তে হয় চালকদের।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, ওই এলাকায় অবৈধ অটোরিক্সার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের স্বাক্ষরিত টোকেন দিয়েই বছরের পর চলে অবৈধ ‘সিলেট-থ-১২-আবেদিত’ বা অনটেস্ট অটোরিক্সাগুলো। নিবন্ধনহীন সহস্্রাধিক সিএনজি অটোরিক্সা বাবদ প্রতিমাসে উত্তোলন করা হয় প্রায় ১০ লাখ টাকা। চালকরা জানান, উত্তোলিত টাকার ভাগ পান সমিতির নেতা, এসএমপির জালাবাদ থানা পুলিশ, শিবেরবাজার ফাঁড়ি পুলিশ । চালকরা জানান, মাসোহারা টোকেন দিয়েই রাস্তায় চলছে এসব গাড়ি। আর এই টোকেন ‘পুলিশ টোকেন’ হিসাবে পরিচিত। প্রশাসনের যথাযথ তদারকির অভাব আর কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তার অবৈধ আয়ের কারণে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না এসব সড়কে অনটেস্ট সিএনজি অটোরিক্সা বাণিজ্য।
স্থানীয় কয়েকজন চালকের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, চলাচলকারী সিএনজি অটোরিক্সার চালকদের নেই কোন লাইসেন্স। কারো কারো লাইসেন্স রয়েছে। সেটি জাল বলেও জানান অনেক চালক।
তেমুখী থেকে ইসলামগঞ্জ বাজার পর্যন্ত সিএনটি অটোরিক্সা চালায় অহিম নামে একচালক। সে জানায়, আমি স্কুলে পড়ি, বন্ধের সময় এই গাড়ি চালাই। মালিককে রোজ দিতে হয় ৫শ’ টাকা করে। মালিক পুলিশ টোকেন সংগ্রহ করে দিয়েছেন। তাই আমার ও গাড়ির কোনো লাইসেন্স লাগে না। তবে তেমুখীর বাইরে শহরের দিকে যেতে পারি না। অনুরূপ বলেন আলাল নামের আরেক চালক। তিনি বলেন-আমি বিদেশ ফেরত,বাবা একটি সিএনজি অটোরিক্শা কিনে দিয়েছিলেন। এই অটোরিক্শার কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই, আমারও ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। প্রতিমাসে ১ হাজার টাকা দিয়ে সমতি থেকে একটি পুলিশ টোকেন নিতে হয়। ফলে গাড়ি চালাতে আর কোনো সমস্যা থাকে না। ইসলামপুর বাজার অটোরিক্শা স্ট্যান্ডের মাধ্যমেই এ টোকেন সংগ্রহ করতে হয়।
জালাবাদ থানাধীন সোনতলার আমজাদ আলী নামের এক চালক জানান, আমি প্রথমে ঠেলাগাড়ি চালাতাম, এ থেকে আমার সংসার চলতো না। তাই সিএনজি অটোরিক্সা চালাতে শিখি। আমার গাড়ির কোন রেজিস্টেশন নেই। যে ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে সেটিও জাল। জাল লাইসেন্স কেন এমন প্রশ্নের জবাবে আমজাদ জানান, ওই তেমুখী বাদাঘাট উত্তর এলাকার রোডগুলোতে চলাচল করতে অরিজিনাল কোন লাইসেন্সের প্রয়োজন হয়না। একটা শো’ রাখতে হয়। তিনি বলেন- আমরা সর্বদা ৫ জন যাত্রী নিয়েই চলতে পারি। নগরের অন্যান্য এলকার মত আমাদেরকে ৩ জন যাত্রী নিয়ে চলতে হয় না। যাদের লাইসেন্স আছে, কিন্তু পুলিশ টোকেন নেই, তাদেরকে ৩ জন নিয়েই চলতে হয়, কিন্তু আমার মত যাদের পুলিশ টোকেন আছে তারা স্বাধীন। তিনি বলেন- লাইসেন্স নিতে বিআরটিএ অফিসে গেলে আমাদের ঘিরে ধরে দালালরা। নেওয়া হয় বেশী টাকা। একটি লাইসেন্স করতে দালালরা ১০ হাজার টাকা নেয়। লাইসেন্স থাকলেও যেখানে কোনো কোনভাবে পুলিশকে টাকা দিতে হয়, তাই একটি টোকেন নিয়ে নিলে আর কোনো পুলিশী ঝামেলায় পড়তে হয় না। প্রতিমাসে ১ হাজার টাকার বিনিময়ে রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই তার গাড়ি চলছে। অনেক সময় পুলিশ গাড়ি আটক করলেও টোকেন দেখা মাত্রই ছেড়ে দেয়। তিনি আরও জানান, ওই রোডে চলাচলকারী অনটেস্ট সিএনজি অটোরিক্সার মালিকরা পুলিশ টোকেন দিয়ে রাস্তায় এসব গাড়ি চালাচ্ছে। আবার অনেক সিএনজি অটোরিক্সার মালিক এ ধরণের ঝুঁকি না নিয়ে অপেক্ষার পর কম দামে গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন। তার দুটি গাড়ির মধ্যে এধরনের একটি গাড়ি অনেক কমদামে কেনেন বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, তেমুখী ও টুকেরবাজার থেকে উত্তরাঞ্চলের সব কটি আঞ্চলিক সড়ক সিলেট মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশের (এসএমপি’র) আওতাধীন থাকলেও এগুলো তদারকিতে ট্রাফিক পুলিশের নেই। এসএমপি’র জালাবাদ থানা ও শিবেরবাজার ফাড়ি পুলিশই এসব সড়কের যান চলাচল তদারকি করে থাকে। ট্রাফিক কর্তৃপক্ষের সাথে থানা ও ফাড়ি পুলিশের লেন-দেন রয়েছে। আর এর বদৌলতেই জালালাবাদ থানা ও শিবের বাজার ফাড়ি পুলিশ টোকেন দিয়েই এসব গাড়ি চলাচল করতে দেয় বলে অভিযোগে প্রকাশ।
এসএমপি’র জালাবাদ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ নাজমুল হুদা খান বলেন-আমাদের থানা এলাকার তেমুখী থেকে কোনো সড়কেই এসএমপি’র ট্রাফিক পুলিশের ডিউটি নেই। থানার দু’একটি টিম মাঝেমধ্যে চেকপোস্ট বসিয়ে গাড়িগুলো চেক করে থাকে। তবে টোকেন দিয়ে অনটেস্ট অটোরিক্সা বা ব্যটারী চালিত টমটম চালানোর কোনো অনুমতি দেওয়ার অথোরিটি থানা পুলিশের নেই। এরকম কেউ বলে থাকলে বা পুলিশ টোকেন দিয়ে থাকলে আমাদের জানালে আমরা তার বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেবো।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

August 2022
S S M T W T F
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

সর্বশেষ খবর

………………………..