সুনামগঞ্জের শ্রেষ্ঠ ওসি মাহবুবের বদলীতে জনমনে ক্ষোভ প্রকাশ

প্রকাশিত: ৮:২৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩০, ২০২২

সুনামগঞ্জের শ্রেষ্ঠ ওসি মাহবুবের বদলীতে জনমনে ক্ষোভ প্রকাশ

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :: সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মাহবুবুর রহমানের ভালো কাজে বাধাঁ হয়ে দাড়িয়েছিল স্থানীয় প্রভাবশালী স্বার্থন্বেষী মহল। ঈর্ষায় পড়তে হয়েছে বেশকিছু মাদক কারবারীর রোষানলে। সেই স্বার্থন্বেষী মহল থানার দালাল মাদক কারবারীরা অবশেষে জিতেও যায়। ওসি মাহবুবুর রহমান বদলীর আদেশে ছাতক উপজেলা যেন আবার অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য না হয় সেই দূচিন্তায় সমাজের সচেতন মহলের।
জানা যায়, মাহবুবুর রহমান চলতি বছরের জানুয়ারীতে পুলিশ বিভাগের ঊর্ধতন কতৃপক্ষের র্নিদেশে ছাতক থানায় বদলী হয়ে আসেন। তিনি যোগদানের পর বদলে গেছে ছাতক থানার চিত্র। ব্যাপক উন্নতি হয়েছে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির। সম্প্রতি থানায় কমতে শুরু করেছে মিথ্যা মামলা রুজুর সংখ্যা। নিয়মিত অভিযানে বেড়েছে পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তারের সংখ্যা। পুলিশের কঠোর নজরদারিতে কমেছে উপজেলায় মাদক, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই ও দস্যুতার মতো ঘটনা। নেই ধর্ষণ কিংবা গণধর্ষনের মতো লোমহর্ষক ঘটনা । চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দুর্ধষ ১৬ জন আন্তঃজেলা ডাকাত সর্দারকে গ্রেপ্তার সহ বিগত বছর ও চলতি বছরের ১০মাসের অপরাধ পরিসংখ্যান যাচাই করে নিন্মুক্ত তথ্য পাওয়া গেছে। তবে হঠাৎ বদলীর আদেশে স্যোসাল মিডিয়ায় অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে স্ট্রেটাস ও লিখেছেন।
ছাতক পাথর ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক সামছু মিয়া বলেন, ওসি সাহেবের বদলীতে সব চেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারন মানুষ। আমি নিজেই তার স্বাক্ষী। তিনি বহুজনের উপকার করেছেন থানায় মামলা না করিয়ে কতো পরিবারকে বাচিঁয়েছেন। আমি ঝগড়ার পর মামলা নিয়ে গিয়েছিলাম ওসি সাহেব বুঝিয়ে বলাতে পরে আমি আর মামলায় যাই নি। যার বিরোদ্ধে মামলা করতে গিয়েছিলাম আজ সে আমার ঘনিষ্টজন। তখন মামলা হলে আজকের এই সম্পর্ক থাকতো না। তিনি আরও জানান, অবৈধ ভাবে বালু পাথর উত্তোলন কারী ব্যবসায়িরা ওসি মাহবুব সাহেবের নাম শুনতে পারতো না। কারনছিল তিনি থানার ওসি থাকার সুবাদে অবৈধ ইনকাম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
এছাড়াও বর্তমানে ছাতক থানা দালাল মুক্ত হওয়ায় স্থানীয়রা আইনি সেবা পেতে অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। ওসির সেই ভালো কাজে বাধাঁ হয়ে দাড়িয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী স্বার্থন্বেষী একটি মহল। গোপনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকরে বহুদিন যাবৎ সড়িয়ে দিতে চাইছিলেন সেই মহলটি! এতে তারা সফল হয়েছে । সেই প্রভাবশালী স্বার্থন্বেষী মহল ছাতক উপজেলাকে পূর্বের মতোই অপরাধের রাজ্য গড়তে উঠেপরে লেগেছে।
থানার অপরাধ পরিসংখ্যান তথ্যনুঅনুযায়ী জানা যায়, ২০২১ সালের জানুয়ারি হতে নভেম্বর ২০২১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন মামলা সংখ্যা দাড়িয়েছিল ৩৩৫টি, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরে মামলা ১৮২টি, প্রায় দেড় মাস অবশিষ্ট থাকার পরও মামলা কমেছে ১৫৩টি, এজাহারে নেই গণধর্ষণ, দূর্র্দষ ডাকাতি মামলা।
ছাতক সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি বদলী হলে সাধারন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আরও জানান- অনেক মামলা তিনি না নিয়ে স্থায়ী সমাধান করে দিছেন।
এদিকে- চলতি বছরের জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর মাসে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে অভিন্ন মানদন্ডে পঞ্চম বারের মতো সুনামগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি হিসেবে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সম্মাণনা পাওয়া ছাড়াও এবারে প্রলয়ংকারী বন্যায় নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের হাতে রান্না করা খাবার ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে অকল্পনীয় ভূমিকা রাখায় ওসি মাহবুবুর রহমানকে ভালো ও প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পিপিএম সেবা পদকে ভূসিত করার জন্য গত ৮নভেম্বর ‘২২ রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় সিলেট হতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ঢাকা বরাবরে আবেদন করা হয়েছে বলে জানাগেছে।
থানা এলাকায় অনুসন্ধানে জানা যায়, ছাতক থানা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পূর্বের যেকোনো তুলনায় অত্যান্ত ভালো রয়েছে মর্মে ছাতক থানা এলাকায় সকল মানুষের অভিব্যক্তি। উপজেলার প্রবীণ শিক্ষিত, প্রগতিশীল ও সুশীল সমাজের লোকজনের সাথে আলোচনায় সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেন যে ওসি মাহবুবুর রহমান ছাতক থানায় যোগদানের পর কেউ মিথ্যা মামলা রুজু করতে পারে নি, কমেছে স্বার্থন্বেষী ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্য, ভেঙ্গেছে মাদক কারবারীদের সিন্ডিকেট। সেই সাথে কমেছে নৌ পথে চাঁদাবাজি দাঙ্গা হাঙ্গামা মারামারি। রক্ষা পেয়েছে হাদা টিলা, বন্ধ হয়েছে অবৈধ বালু পাথর উত্তোলন। রক্ষা পেয়েছে নদী তীরবর্তী মানুষের জমি ও বাড়িঘর।
উপজেলা নোয়ারাই ইউনিয়নের মমিন চৌধুরী জানিয়েছেন, ওসি মাহবুবুর রহমান অত্যান্ত পরোপকারী মানুষ। আমি বৃদ্ধ মানুষ একদুবার থানায় গিয়েছিলাম সমস্যা নিয়ে। যেকাজ হাটতে হাটতে করতে পারিনি সেই কাজ তিনি দ্রুত সম্মাণের সহিত করে দিয়েছেন তাও বিনামূল্যে। আমি শুধো একটু বলবো আমি এরকম ছাতক থানা ৭২বছরের জীবনে প্রথম দেখছি। তিনি অন্যত্র বদলীতে ছাতকের গরীব মধ্যবিত্তের সব থেকে বেশী ক্ষতি হবে। উনার বদলীতে এই প্রথম মনে মনে রাগ হয়েছে।
এদিকে, থানার অপরাধ পরিসংখ্যান হিসাব অনুযায়ী- ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত কোন ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। এর মধ্যে দস্যুতা একটি, খুন ৭টি, ধর্ষণ ১৭টি, যৌতুক/অন্যান্য ১৫টি, সিধেল চুরি ৩টি, গবাদি পশুসহ মোট চুরি ১৩টি, পুলিশ আক্রান্ত ২টি, অস্ত্র আইন ৩টি, চোরাচালান ১৪টি, মাদক ২৬টি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ১টি, সড়ক দুর্ঘটনা ২টি, দ্রুত বিচার ৪টিসহ অন্যান্য আইনে ওই বছরের ৭ মাসে মোট মামলা রজু করা হয়েছিল ২১৭টি।
একই সময়ে থানা পুলিশের অভিযানে মোট গ্রেপ্তার করা হয়েছিলে ২০৩ জনকে। মোট গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল করা হয়েছে মোট ১৬১টি। এর মধ্যে জিআর/সিআর মামলায় ১৩৮টি ও সাজাপ্রাপ্ত ২৩ জন আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতে মোট ননএফআইআর প্রসিকিউশন দেওয়া হয়েছে ৯৫টি। এদিকে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত মোট ৭ মাসে মামলা রুজু হয়েছে মাত্র ১০৮টি। এর মধ্যে ৩টি খুন, ধর্ষণ ৭টি, গবাধি পশুসহ মোট চুরি ৪টি, চোরাচালান ১টি, মাদক ২০টি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২টি, সড়ক দুর্ঘটনা ৪টি, দ্রুত বিচার ১টি, অন্যান্য সহ মোট মামলা রুজু করা হয়েছে ৬৬টি। রুজুকৃত মামলাগুলোর মধ্যে কোন ডাকাতির বা গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি।
মামলার রুজুর বিষয়ে কঠোর যাচাই-বাছাইর কারণে ইদানিং মিথ্যা মামলা থেকেও রেহাই পাচ্ছেন স্থানীয় জনসাধারণ। পুলিশ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিতই বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা কারণে এখন উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাইকিং করে বড় রকমের দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনাও কমেছে।
একই সময়ে মোট গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল করা হয়েছে মোট ২৭০টি। এরই মধ্যে জিআর/সিআর মামলায় ২২০টি ও সাজাপ্রাপ্ত ৫৪ জন আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতে মোট ননএফআইআর প্রসিকিউশন দেওয়া হয়েছে ১০৯টি। সর্বশেষ চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৫৪ জন আসামিকে গ্রেপ্তারসহ ১৩৬টি ওয়ারেন্ট নিস্পত্তি করা হয়েছে। এছাড়াও সাড়ে ৪ কেজি গাঁজা ও ৩৬০ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার করা করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভায় জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর মাসের ছাতক থানা এলাকার আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, মামলা রজুসহ সার্বিক বিবেচনায় ৫ম বারের মতো জেলায় শ্রেষ্টত্ব অর্জনকারী হিসেবে ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্বাচিত করা হয়েছিল।
ওসি মাহবুবুর রহমান বদলীর বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ এহ্সান শাহ্ জানিয়েছেন, বদলীর কাগজ এখনো হাতে আসে নি। তাছাড়া সরকারি চাকুরিতে বদলী একটা প্রচলিত নিয়ম। ঊর্ধতন কতৃপক্ষ যেটা ভালো বুঝবেন সেটাই করবেন।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

November 2022
S S M T W T F
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  

সর্বশেষ খবর

………………………..