অপ্রতিরোধ্য মাদক, চোরাচালান : জামাই-শশুরের বাণিজ্য

প্রকাশিত: ৭:৪৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০২৩

অপ্রতিরোধ্য মাদক, চোরাচালান : জামাই-শশুরের বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেটে দিন দিন প্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে মাদক, চোরাচালান। দীর্ঘদিন পর আবারও সীমান্তকেন্দ্রীক চোরাচালান বেড়েছে, বেড়েছে মাদকের সরবরাহ। প্রতিদিনই পুলিশের হাতে ধরা পড়ছে মাদক, চিনিসহ নানা পণ্য। পুলিশের হিসেবে মাসে কোটি টাকার মালামাল আটক হলেও ধরা পড়ছেনা এর সঙ্গে জড়িত কোনো চোরাকারবারী। মাদকের রুট হিসেবে জকিগঞ্জ চিহ্নিত থাকলেও এবার নতুন করে আলোচনায় যোগ হয়েছে জৈন্তাপুর গোয়াইনঘাট। ফলে এনিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পুলিশের মাঝেও উদ্বেগ উৎকন্ঠা বাড়ছে। তবে পুলিশ বলছে তারা এর লাগাম টেনে ধরতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।

জৈন্তাবার্তা’র প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে জানা গেছে, সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাটে বেপরোয়া গতিতে চলছে চোরাচালান। উপজেলার প্রতিটি সীমান্ত পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে ভারতীয় চোরাচালান পণ্য সামগ্রী। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ভারতীয় বিভিন্ন ব্যান্ডের মদ, ইয়াবা, ফেনসিডিল, আমদানি নিষিদ্ধ বিড়ি, সিগারেট, শাড়ী, লেহেঙ্গা, মোবাইল হ্যান্ডসেট, নিম্ন-মানের চা-পাতা, গাড়ীর টায়ার, টিউব সহ যন্ত্রপাতি, মোটরসাইকেল এবং ভারতীয় চিনি, গরু ও মহিষ। ব্যবসায়ীরা বলেন, মোটা অংকের সালামির মাধ্যমে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয় ভারতীয় পণ্য সহ গরু ও মহিষ। সংশ্লিষ্টদের ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত অতিক্রমের কোনো সুযোগ নেই।
সরেজমিনে গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের পান্তুমাই গ্রামের বাসিন্ধা আব্দুল মালিক উরফে ছুবা মালিক ও তার মেয়ের জামাই হাতিরখাল গ্রামের বাসিন্দা কালা এর নেতৃত্বে সোনারহাট বিজিবি ক্যাম্পে এলাকা দিয়ে পালাক্রমে দিনরাত বাংলাদেশে প্রবেশ করছে ভারতীয় চোরাচালান পণ্য সামগ্রী। এই চোরাকারবারীদের কাছ থেকে স্থানীয় বিজিবি ও থানা পুলিশের নামে হাতিয়ে নিচ্ছেন দৈনিক লাখ লাখ টাকা। জামাই-শশুরের এসকল কর্মকান্ডে সরকারকে লাখ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পথে প্রবেশ করছে পণ্য সামগ্রী। এদের সাথে সরাসরি স্থানীয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জড়িত রয়েছেন।

তাদের শেল্টার পেয়ে চোরাকারবারীরা দিন-রাত সমানভাবে পণ্য আদান প্রদানের মহোৎসব চালাচ্ছে। সোনারহাট সীমান্ত এলাকা দখলে থাকে চোরাচালান ব্যবসায়ী ও তাদের বাহিনীর দখলে। কেউ আনছে গরু, মহিষ, দামি শাড়ী, কেউবা আনছে মাদক, আর কেউবা আনছে চা-পাতা, চিনি, কসমেট্রিক্সের চালান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চোরাকারবারী দলের সক্রিয় সদস্যরা বলেন, জামাই-শশুরের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সাথে লিয়াজো করে ভারতীয় পণ্যের চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। প্রতিনিয়ত সীমান্তের বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে বীরদর্পে চলছে চোরাচালানের নিরাপদ বাণিজ্য। বিনিময়ে মোটা অংঙ্কের সালামি পৌঁছে যাচ্ছে নানা মহলে। তারা আরও বলেন, আপনারা (সাংবাদিক) যত লিখবেন তখন তাদের সালামি বেশি দিতে হয়। মাঝে মধ্যে বড় বড় চালান প্রবেশ করাতে গিয়ে লিয়াজোর চাইতে বেশি টাকা দিতে হচ্ছে।

শশুর জামাইয়ের নেতৃত্বে বিজিবি ও পুলিশ লাইনের নামে চোরাকরবারীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে প্রতি বস্তা চিনি থেকে ১৬০ টাকা ও প্রতি খাচা বিড়ি থেকে ৬৫০ টাকা তাছাড়া মাদকের প্রতি ১ হাজার টাকা করে প্রতিদিন অন্তত ১শ থেকে ১৫০ টি গাড়ি অবৈধ ইন্ডিয়ান সামগ্রী নিয়ে ঢুকছে সিলেট শহরে। এতে নীরব ভুমিকা পালন করছে গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি।

অপরদিকে জৈন্তাপুরকে ঘিরেও একই ধরণের চোরাচালান ও মাদক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। জৈন্তাপুর মডেল থানা পুলিশের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মাদক ও চোরাচালান বিরোধী অভিযানে শুধু গত সেপ্টেম্বর মাসে চোরাইপন্য উদ্ধার জনিত বিশেষ ক্ষমতা আইনে ১৮ টি ও মাদক মামলায় ২টি সহ মোট ২০ টি মামলা দায়ের এবং ৯৪ লাখ ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা সমমূল্যে পন্য উদ্ধার করা হয়েছে।

রবিবার (১ অক্টোবর) দৈনিক জৈন্তাবার্তা প্রতিবেদকের সাথে আপালকালে এ তথ্য জানান জৈন্তাপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম পিপিএম। জৈন্তাপুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন ভারতীয় সীমান্তবর্তী হওয়ার সুবাদে সক্রিয় চোরাকারবারির বিভিন্ন সময়ে মহাসড়ক ও নৌরুট ব্যবহার করে গরু,মহিষ,চিনি,কসমেটিকস, মোবাইল সহ বিভিন্ন ধরণের মাদক ও ভারতীয় ঔষধ পাচার করে আসছে।

জৈন্তাপুর মডেল থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন সময়ে নিয়মিত পন্য আটক সহ মামলা দায়ের করা হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে পুলিশের অভিযানে সবচেয়ে বেশী আটককৃত পন্যের অন্যতম চিনি। এ মাসে মোট আটককৃত চিনির পরিমান ১৯৫০০ কেজি।

আটককৃত গরু ও মহিষসের মধ্যে ৩১টি গরু ও ৩২টি মহিষ বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া গত মাসে ১৩ ই সেপ্টেম্বর জৈন্তাপুর কাটাগাঙ নামক স্হান হতে ২৯৭ পিস মোবাইল ফোন সহ একজনকে আটক করা হয়। উদ্বারকৃত মোবাইলগুলোর বাজারমূল্য ৩৫ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।

এছাড়াও গত মাসে গরুমহিষ, চিনি, মোবাইলের পাশাপাশি ভারতীয় ৬০০ কেজি চা পাতা, ৬০০ গ্রাম গাঁজা ও ৩২ বোতল বিভিন্ন ব্রান্ডের বিদেশী মদ রয়েছে। সেই সাথে ১৮ই সেপ্টেম্বরে বিশেষ এক অভিযানে ৮ লক্ষ ৭ হাজার টাকা মূল্যের যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট সহ বিভিন্ন ধরণের ঔষধ আটক করা হয়।

এ বিষয়ে প্রতিবেদককে ওসি তাজুল ইসলাম পিপিএম আরো জানান, সিলেট জেলা পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন মহোদয়ের সার্বিক দিকনির্দেশনায় মাদক ও চোরাচালান বিরোধী অভিযানে পুলিশ তৎপর রয়েছে। জৈন্তাপুর উপজেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও চোরাচালান মাদকবিরোধী অভিযান করতে পুলিশের টহল আরো জোরদার করা হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

October 2023
S S M T W T F
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

সর্বশেষ খবর

………………………..