সিলেট সদর ভূমি অফিসে দালালদের স্বর্গরাজ্য

প্রকাশিত: ১১:৫৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৬, ২০২২

সিলেট সদর ভূমি অফিসে দালালদের স্বর্গরাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেট সদর উপজেলা ভূমি অফিস যেন ঘুষ-দুর্নীতি ও দালালদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। এখানে ঘুষ ছাড়া কোন কাজই হয় না। দালাল না ধরলে নড়ে না কোন ফাইল। ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের মূল্য তালিকা সম্বলিত সাইনবোর্ড ও কাগজ সরবরাহের নির্ধারিত সময়ের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তা’ কেবলই লোক দেখানো মাত্র। সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী সেবা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ও আসছে সিলেট সদর ভূমি অফিসের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি আর ঘুষ বাণিজ্যের হালচিত্র। অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারি পরিবেষ্টিত সিলেট সদর উপজেলা ভূমি অফিসে দালালদের কাছে কোন কাজই অসাধ্য নয়। জমির বৈধ মালিক যেই হোন না কেন, চাহিদা মত টাকা এবং দাগ খতিয়ান নম্বর দিলেই তা হয়ে যায় অন্যের। আবার বৈধ কাগজপত্র থাকা স্বত্ত্বেও ঘুষের রেটে হেরফের হলেই প্রকৃত ভূমি মালিকদের হতে হয় চরম হয়রানির শিকার। জমির নামজারি করতে সরকার-নির্ধারিত ফি যেখানে ১ হাজার ১৫০ টাকা । সেখানে ভোক্তভোগীদের গুনতে হয় হাজারো-লাখো টাকা।
অভিযোগের সত্যতা খুঁজতে পরিচয় গোপন রেখে গ্রাহক সেজে এক দালালের কাছে নামজারি করার কথা বলতে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘খাজনাসহ ২০,০০০/ টাকায় নামজারি পর্চা করে দিতে পারবেন।’ খাজনা পরিশোধ রয়েছে এমন কথা জানালে ওই দালাল বলেন তা’ হলে ১৮,০০০/ টাকা লাগবে। ২০ হাজার টাকার নিচে কোন কাজই হাতেই নেয় না । আর সিটি কর্পোরেশনের ভেতরের জায়গা হলে ৩০ হাজার টাকার নিচে কোন কাজ হাতে নেয় না বলে জনায় ওই দালাল।
দালাল-কর্মচারী সবাই মিলে সিলেট সদর ভূমি অফিসে গড়ে তুলেছে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট। ফলে দালালের উৎপাতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। ওই দালালদের নেই কোন লুকোচুরি, লাজ-লজ্জা ও ভয়ভীতি কিছুই নেই। এমনভাবে ঘুষের দরদাম চলে, এ যেন নগরের কাজির বাজারের গরুছাগলের বেচা-কেনা। দাবিমত টাকা দিলে ভূমি সংক্রান্ত দখল প্রতিবেদন, কানুনগো রিপোট, সার্ভে রিপোট এবং খতিয়ানের জমি সংক্রান্ত তথ্য পাল্টে যাওয়ার মত গুরুতর ঘটনাও ঘটছে এ অফিসে।
এ সব অনিয়মের বেড়াজালে প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। জাল দলিল, পর্চা, মৌজা ম্যাপ (নকশা), একই জমি বহু জনের কাছে বিক্রি, রেকর্ডের সময় নির্ধারিত লোকের অনুপস্থিতিতে তার জমি নিজের অংশের মধ্যে ঢোকানোসহ নানা ধরনের দূর্নীতির সঙ্গে পরিচিত ভূক্তভোগীরা।
দলিলপত্র ঠিক থাকলে টাকার পরিমাণ কম রাখা হয়। একটু এদিক-সেদিক হলে আর রক্ষা নেই, কাড়ি কাড়ি টাকা ঢেলেও নিস্তার মেলে না। এমনকি ‘র’-র নিচে বিন্দু না পড়লেই টাকার অংক বেড়ে যায় কয়েক হাজার।
সিলেট সদর ভূমি অফিসে কর্মচারীর চেয়ে বাইরের দালালের সংখ্যা বেশি। এসব দালালরা সরকারি কর্মচারীর মত বিভিন্ন রেকর্ড ও ফাইলপত্র নাড়াচাড়া করে। দেখে বুঝার উপায় নেই এরা বাইরের লোক।
অভিযোগ রয়েছে, এসব দালালরা বালামে ভুল ও মিথ্যা তথ্য সংযোজন করে আবার তা ঠিক করে দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ভূমি মালিকের নিকট থেকে হাতিয়ে নেয় হাজার হাজার টাকা। এমনকি আক্ষরিকভাবে রেকর্ড বদলে দিয়ে ভুয়া নামজারি করিয়ে দেওয়ারও শত শত প্রমান রয়েছে সিলেট সদর ভূমি অফিসে।
সরেজমিনে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সিলেট সদর ভূমি অফিসে শতাধিক দালাল সক্রিয় রয়েছে। এরা নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে উপজেলা ভূমি অফিসসহ সকল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কাজকর্ম। এসব দালালদের কাছে জিম্মি সেবা গ্রহীতা সাধারণ মানুষ। উপজেলা সদর অফিস ছাড়াও প্রতিটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস ঘিরে রয়েছে দালালরা। যারা টাকার বিনিময়ে নমজারী আবেদন দাখিলের আগেই তহসিলদার ও কানুনগো প্রতিবেদন, সার্ভে রিপোর্ট প্রস্তুত করিয়ে রাখতে পারে। সবকিছু ঠিকটাক হলে পরে সরকারী ফি দাখিল ও রিপোর্টগুলোর স্মারক-তারিখ বসানো হয় এবং তা দাখিল করা হয়।
সিলেট সদরের জালালাবাদ থানা এলাকার একজন জানান, ‘জমি কিনে বাড়ি করেছি, কিন্তু নামজারী করাতে পারিনি। নামজারীর জন্য টাকা ও কাগজপত্র দালালের কাছে দিয়েছি, সব রিপোর্ট রেডি হলে পরে সরকারী ফি দিয়ে আবেদন দাখিল করা হবে। আবেদন দাখিল ও প্রাথমিক আদেশের পর রিপোর্টগুলো তারিখ বসিয়ে ফাইলের সাথে সংযুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছে দালাল।
সূত্রমতে দালালরা আগে থেকেই ইউনিয়ন ভূমি অফিস, কানুনগো ও সার্ভে অফিসে তাদের কাজ বুকিং করে রাখে। বুকিং অনুযায়ী আগের কাজ আগে এবং পরর কাজ পরে করা হয়। ফলে অনেক সময় নামজারীতে বিলম্ব হয়ে থাকে।
বটেশ^^র থেকে আসা এক ব্যক্তি বলেন, ২০ দিন আগে তিনি আবেদন দিয়েছেন। তবে এখনো কাজ হয়নি। ঈদের পর আসতে বলেছেন। তিনি সরকার-নির্ধারিত ১ হাজার ১৫০ টাকাই জমা দিয়েছেন। অতিরিক্ত টাকা না দেওয়ায় তাঁকে ঘোরানো হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভূক্তভোগী বলেন, ভূমি অফিসের দেয়ালও যেন ঘুষ খায়। তহশিলদার ও কর্মচারীরা দিনে কত টাকা যে ঘুষ নেয় তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। ভূমি অফিসের ঘুষ দুর্নীতির বিষয় সকলেরই জানা, তার পরও কোন প্রতিকার নেই। প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেনের এমন দৃশ্য দেখলে মনে হবে এ যেন সর্ষের মধ্যে ভূত। অফিসের সিসি ক্যামেরাগুলো সুবিধাজনকভাবে বসানো থাকে। কয়েকটি কক্ষে অকেজো করে অথবা ক্যামেরার মূখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখা হয় যাতে ঘুষ লেন-দেনর কোন ডকুমেন্ট ক্যামেরায় না আসে।
সূত্র জানায়-সিলেট সদর ভূমি অফিসে কর্মরত (স্থানীয়) কয়েকজন কর্মচারী ঘুষ বাণিজ্য করে কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। ঘুষের টাকায় সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকায় কোটি-কোটি টাকার জমি ও বাড়ি কিনেছেন। এ রকম বহু কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-অভিযোগের শেষ নেই। সিলেট সদর ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালাল সিন্ডিকেটের নাম পরিচয়ের একটি খতিয়ান ইতোমধ্যে সোনালী সিলেট-এর হস্তগত হয়েছে। ক্রমান্বয়ে নাম-পরিচয়সহ প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ পাবে।
সিলেট সদর ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারিয়া সুলতানার বক্তব্য নিতে শুক্র ও শনিবার দু’দিন ধরে তার মোবাইল ফোনে বারবার কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

April 2022
S S M T W T F
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30  

সর্বশেষ খবর

………………………..