ঢাকায় আ.লীগ নেতাকে অপহরণে জড়িত সুনামগঞ্জের নাজমুল

প্রকাশিত: ৬:০৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৬, ২০২২

ঢাকায় আ.লীগ নেতাকে অপহরণে জড়িত সুনামগঞ্জের নাজমুল

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যবসায়ীকে অপহরণ ও অর্থ আদায়ে গ্রেপ্তার (বাঁ থেকে) পুলিশ সদস্য শেখ ফরিদ, মুনশি আবদুর রহমান ও নাজমুল হোসেন রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে থেকে পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী ও দলটির কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য মাহবুব আলী খানকে ধরে নিয়ে যান কয়েকজন ব্যক্তি। এ সময় অন্যরা এগিয়ে এলে তাঁরা নিজেদের পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্য পরিচয় দেন। পরে মাহবুবকে নির্যাতনের মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে তিন লাখ টাকা আদায় করা হয়। পরদিন প্রতারণার মাধ্যমে মিথ্যা মামলায় আসামি সাজিয়ে আদালতে তোলা হয়। পাঁচ দিন কারাভোগের পর বেরিয়ে আসেন মাহবুব। এরপর তাঁকে অপহরণ ও অর্থ আদায়ের ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের জড়িত থাকার তথ্য বেরিয়ে আসে।

এ ঘটনায় পুলিশের চার সদস্যসহ ছয়জন গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে। ঘটনা অনুসন্ধানে জানা যায়, ওমর ফারুক নামের এক সৌদিপ্রবাসীর নির্দেশে ব্যবসায়ী মাহবুব আলী খানকে অপহরণ করেছিলেন এই পুলিশ সদস্যরা। সুনামগঞ্জ পুলিশের কনস্টেবল নাজমুল হোসেনের নেতৃত্বে ওয়ারী থানার একজন কনস্টেবল, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) দুই পুলিশ সদস্যসহ ১০ থেকে ১২ জন এই অপহরণে জড়িত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সৌদিপ্রবাসী ফেনীর ওমর ফারুকের সঙ্গে কয়েক বছর আগে মাহবুবের পরিচয় হয়েছিল। গত অক্টোবর মাসে মাহবুবকে ফোন করে ফারুক বলেন, সৌদি থেকে একজন যাত্রীর মাধ্যমে স্বর্ণালংকারসহ কিছু জিনিস পাঠাবেন। তিনি যেন কাউকে পাঠিয়ে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে সেগুলো এনে রাখেন। ওমর ফারুকের পাঠানো জিনিসপত্র আনতে মাহবুব তাঁর এলাকার রবিন নামের এক যুবককে ঢাকা বিমানবন্দরে পাঠান। বিমানবন্দর থেকে ওই ব্যাগ নিয়ে আসার সময় বনানীর কাকলী এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন রবিন। পরে ঘটনাটি ওমর ফারুককে জানান মাহবুব।

প্রায় ২০ লাখ টাকার জিনিসপত্র হারিয়ে ওমর ফারুক এবার এই ঘটনার জন্য ব্যবসায়ী মাহবুবকেই সন্দেহ করতে থাকেন। ফারুক ঘটনাটি তাঁর পরিচিত মতিউরকে জানান।

মাহবুবের কাছ থেকে টাকা তুলতে মতিউর দায়িত্ব দেন জুবায়ের নামের আরেকজনকে। এই জুবায়ের সুনামগঞ্জে কর্মরত পুলিশ সদস্য নাজমুল হোসেনের সঙ্গে এ বিষয়ে একটি চুক্তি করেন। মাহবুবের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করে দিলে তার একটি অংশ ওই পুলিশ সদস্যকে দেবেন বলে প্রস্তাব দেন। নাজমুল হোসেন সুনামগঞ্জে বদলি হওয়ার আগে ঢাকার মালিবাগে সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই অপহরণের সঙ্গে সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত মুনশি আবদুর রহমান (৩০) ও পুলিশ সদস্য শেখ ফরিদ (৩০) ও ওয়ারী থানার পুলিশ সদস্য আকবর জড়িত ছিলেন। পুলিশের ৪ সদস্যসহ ১০ থেকে ১২ জন মাহবুব আলীকে অপহরণ করেন।

মাহবুব আলী বলেন, ‘ব্যাগটি ছিনতাই হয়েছিল। আমি নাজমুলসহ সবাইকে অনুরোধ করেছিলাম বনানী এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করার জন্য। কিন্তু তাঁরা এ ঘটনার জন্য আমাকে অপহরণ করে আট লাখ টাকা দাবি করেন। রাতভর নির্যাতন করে আমার কাছ থেকে তিন লাখ টাকা আদায় করেন।’

যেভাবে অপহরণ ও অর্থ আদায়>>

১ নভেম্বর সন্ধ্যার পর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের সভাপতির কার্যালয়ের সামনে আসেন মাহবুব আলী। সেখানে দাঁড়িয়ে দলীয় নেতা–কর্মীদের সঙ্গে আলাপ করছিলেন তিনি। একপর্যায়ে রাকিব নামের একজন এসে তাঁর কলার চেপে ধরেন। এ সময় পেছন থেকে আরও তিন-চারজন মাহবুবকে ঘিরে ধরেন। তারপর শুরু হয় এলোপাতাড়ি মারধর। ঘটনা দেখে এগিয়ে আসেন অনেকেই। পরে অপহরণকারীরা নিজেদের সিআইডি পুলিশ বলে পরিচয় দিলে এগিয়ে আসা লোকজন চলে যান। তাঁকে অপহরণের দৃশ্যটি ওই এলাকার একাধিক ভবনের সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

ওই দিনের ঘটনার বর্ণনায় মাহবুব আলী বলেন, ‘আওয়ামী  লীগ অফিসের সামনে থেকে আমাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসা হয় ধানমন্ডি লেক এলাকায়। সেখানে গাছের নিচে বসিয়ে আমাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়।’ তিনি বলেন, একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে পল্টনের ইসলাম টাওয়ারের আন্ডারগ্রাউন্ডে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। টাকা আদায়ের জন্য তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়।

মাহবুব বলেন, নির্যাতনের একপর্যায়ে রাত ১১টা ৫ মিনিটের দিকে তিনি টাকা দিতে রাজি হলে তাঁকে কমলাপুর রেলস্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট থেকে প্রথমে তিনি ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা উত্তোলন করে অপহরণকারী চক্রের হাতে তুলে দেন। দোকানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে টাকা তোলার দৃশ্য ধরা পড়ে। টাকা তোলার পর গভীর রাতে তাঁকে আনা হয় মালিবাগে সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে। পরদিন তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে পুরান ঢাকার নবাবপুরের রথখোলা মোড়ের ঈশিতা হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ওয়ারী থানার কনস্টেবল আকবর ৩০০ টাকায় হোটেলের কক্ষ ভাড়া নিয়েছিলেন। সেখানে আটকে রেখে আত্মীয়স্বজনকে ফোন করিয়ে আরও প্রায় দুই লাখ টাকা বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আনিয়ে নেন চক্রের সদস্যরা। সেখান থেকে আদালতে রেখে পালিয়ে যান তাঁরা।

সিআইডি সূত্র জানায়, গত ১৯ মে সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে জাল কোর্ট ফি বিক্রির সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণ দল।

এ ঘটনায় সিআইডির উপপরিদর্শক (এসআই) হাসান আহম্মেদ বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেন। এই মামলার নথিপত্র চুরি করে ব্যবসায়ী মাহবুবকে অপহরণের পর তাঁকে ওই প্রতারক চক্রের সদস্য হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। পরে বিষয়টি জানার পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন আদালতে প্রতিবেদন দেন। সেই প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ‘মাহবুব আলী খানকে আমার তদন্তাধীন মামলার নাম এবং আমার স্বাক্ষর জাল করে আদালতে প্রতিবেদনসহ সোপর্দ করা হয়েছে। মাহবুব ওই মামলার এজাহারভুক্ত বা সন্দেহভাজন আসামি নন। তাঁকে আমি গ্রেপ্তার করিনি এবং আদালতেও প্রেরণ করিনি।’

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আদালত সিআইডিকে জড়িত পুলিশ সদস্যসহ অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশনা দেন। এ ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা করেছে সিআইডি। আর অপহৃত ব্যবসায়ী মাহবুব আলী ধানমন্ডি থানায় আরেকটি মামলা করেন। ওই মামলা তদন্তের দায়িত্বে থাকা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গত ৯ নভেম্বর অপহরণে জড়িত তিন পুলিশ সদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আনিচুর রহমান বলেন, ‘আদালতের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে আমরা এই ঘটনায় জড়িত নাজমুলসহ তিন পুলিশ সদস্যকে চিহ্নিত করি। নাজমুল একসময় সিআইডিতে কাজ করেছেন।’ তিনি বলেন, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় মামলা করা হয়েছে। সিআইডির পক্ষ থেকে তাঁর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তাঁরা পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছেন।

ঘটনার পরপর ছয়জন ধরা পড়লেও পরে আর কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। এ নিয়ে হতাশা জানিয়ে মাহবুব আলী বলেন, ‘এত দিন হয়ে গেল আমার টাকাগুলোও উদ্ধার হয়নি।’

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

December 2022
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

সর্বশেষ খবর

………………………..