১৪ কোটি টাকার নথি গায়েব, অনুসন্ধানে দুদক!

প্রকাশিত: ৭:৫০ অপরাহ্ণ, মে ৪, ২০২৩

১৪ কোটি টাকার নথি গায়েব, অনুসন্ধানে দুদক!

ডেস্ক রিপোর্ট: সিলেটের জকিগঞ্জে ২ কোটি ৪৩ লাখ ৯০ হাজার টাকার দুর্নীতির সত্যতা জানতে গিয়ে ১৩ কোটি ৯৫ লাখ ৯৬ হাজার টাকা লোপাটের তথ্য পেয়েছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ রসায়নে এ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এবার তাদের অধিদপ্তর ছাড়তে হয়েছে । এই ১০ জন অসাধু কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারী ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিলেও অধিদপ্তর এখনও দৃশ্যমান কোনো আইনী ব্যবস্থা নেয়নি।

 

উচ্চ মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের শিক্ষিত আগ্রহী বেকার যুবক ও যুব মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানে আগ্রহী করার লক্ষ্যে ২০১০ সালে এনএসপির উদ্যোগ নেয় সরকার। এনএসপি নীতিমালা অনুসারে কৃষি, শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, গবাদি পশু পালন, চরিত্র গঠনমূলক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ অন্তত ১০ বিষয়ে তিন মাস প্রশিক্ষণের পর সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বেকার যুবকদের কাজে লাগাতে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে সিলেটের জকিগঞ্জে এ কর্মসূচির প্রায় আড়াই কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর মন্ত্রণালয়ের ক্রীড়া-২ অধিশাখার উপসচিব ফজলে এলাহীকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটি চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ের যুব-২ শাখার উপসচিব সিরাজুর রহমান ভূঞা স্বাক্ষরিত স্মারকে তদন্তে উঠে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম উল্লেখ করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়।

 

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক (অর্থ ও অডিট) আলী আশরাফ, হিসাবরক্ষক নুরুল আমিন, সিলেটের জকিগঞ্জের যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আজহারুল কবীর, এনএসপির সাবেক যুগ্ম সচিব জাহাঙ্গীর আলম (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত), এনএসপির সাবেক পরিচালক আবুল ফয়েজ মো. আলাউদ্দিন খান, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক বাবুল পাটোয়ারি, উপপরিচালক (এনএসপি ও প্রশিক্ষণ) ফারহাত নূর, এনএসপির সাবেক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ফজলুল হক এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক জসিম উদ্দিন দুর্নীতির সাথে জড়িত নাম এসেছে। জড়িত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের গত ২৩ মার্চ বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হয়েছে।

 

তারা অনেকেই এখন ছুটিতে থেকে বদলি ফেরাতে বিভিন্ন দপ্তরে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) জানিয়েছেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের সচিব জানিয়েছেন, এ বিষয়ে নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা প্রতিবেদন দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছেন জানিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আজহারুল ইসলাম খান প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নথি পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগটি ভালো। এটাকে কেন্দ্র করে ১৪ কোটি টাকার দুর্নীতিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব করার সুযোগ নেই। এমন হলে দুর্নীতিবাজরা আরও অনিয়মের সুযোগ পাবে।

 

যেভাবে টাকা লোপাট: যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং সিলেটের জকিগঞ্জের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী পরস্পর যোগসাজশে ১৪ কোটি টাকা লোপাট,নথি গায়েব,সরকারী টাকা আত্বসাত, ১০ কর্মকর্তার নিজ জেলায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ ,আলিশান বাড়ি নির্মান, স্ত্রী ও আত্বীয়স্বজনের ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকা রাখার অভিযোগও আছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, তারা নাকি দুদকের নজরধারীতে আছে। তাদের নামে দুর্নীতিদমন কমিশন দুদক কার্যালয়ে একজন বাদী হয়ে অভিযোগ দায়ের করেছেন। ১৪ কোটি টাকার দুর্নীতির মহা নায়ক উপপরিচালক (অর্থ ও অডিট) আলী আশরাফ । তিনি বরাদ্দ, এন্ট্রি দেওয়া, অনুমোদনের কাজটি সমন্বয় করেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সরকারি অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে আলী আশরাফ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন মর্মে প্রমাণিত হয়েছে। অভিযোগ আছে, তারা বদলি ঠেকাতে মন্ত্রনালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন। ডিডি আলী আশরাফ ২২ বছর অধিদপ্তরেই ঘুরেফিরে কর্মরত ছিলেন। তার রয়েছে বিশাল একটি সিন্ডিকেট । তারা বিভিন্ন সময়ে তার রুমে বসে থাকে। অভিযোগ আছে, আলী আশরাফ প্রায় ৩০ কোটি টাকার মালিক। এত টাকা কোথায় পেলেন? দুদকের অনুসন্ধান চলছে।

 

জানাগেছে, দুদকের হাত থেকে রেহাই পেতে কানাডা যাওয়ার পরিকল্পনা করছে ডিডি আলী আশরাফ। দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগ থেকে জানাগেছে, ১৪ কোটি টাকার দুর্নীতির ঘটনায় যে কোন সময় গ্রেফতার হতে পারেন উপপরিচালক (অর্থ ও অডিট) আলী আশরাফসহ কয়েকজন । তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে অভিযোগ ওঠা প্রায় আড়াই কোটি টাকা অবৈধভাবে ওঠানোর তদন্ত করতে গিয়ে এর আগের অর্থবছরেও (২০২০-২১) অবৈধভাবে টাকা উত্তোলনের প্রমাণ মেলে। দেখা গেছে, উল্লিখিত দুই অর্থবছরে সিলেটর জকিগঞ্জ এনএসপির আওতাধীনই ছিল না। তবু যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং জকিগঞ্জের যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে টাকা তোলা হয়েছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, অধিদপ্তর থেকে উপজেলা পর্যায়ে টাকার ছাড় পেতে নিশ্চিতভাবে ডিজির অনুমোদন নিতে হয়।

 

যেসব উপজেলায় টাকা যায়, সেখানেও ডিজির সম্মতি পৌঁছার পরেই শুধু ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীরা টাকা তুলতে পারেন। একাধিক স্তরে যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকার পরও এত বড় অঙ্কের টাকা কীভাবে লোপাট করা হলো এমন প্রশ্নের জবাবে অধিদপ্তর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুর্নীতি তো নিয়ম মেনে হয় না। অভিযুক্তরা কিছু টাকা জকিগঞ্জে স্থানান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন। আর কিছু টাকা ঢাকাতেই কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে নিজেদের নামে সাময়িক অ্যাকাউন্ট খুলে স্থানান্তর করে টাকা উঠিয়ে নিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থবছর অনুযায়ী যেসব উপজেলায় টাকা যাওয়ার কথা, সেসব উপজেলায় টাকা ছাড়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদেশে ডিজির অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে ওই আদেশের সঙ্গে যুক্ত উপজেলাগুলোর তালিকায় ডিজির সই পাওয়া যায়নি। এই জায়গাতেই সংশ্লিষ্টরা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের, যাতে ডিজিরও দায় রয়েছে।

 

তবে মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন উপসচিব মর্যাদার এক কর্মকর্তা। তাই তদন্ত কমিটি (অতিরিক্ত সচিব মর্যাদার) ডিজিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেনি। এ কারণে এনএসপির সার্বিক কার্যক্রম তদারকিতে একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে যুব মন্ত্রণালয়। সিলেটের জকিগঞ্জের যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আজহারুল কবীর ঘটনার পর থেকে পলাতক। এক পর্যায়ে তিনি কানাডা যাওয়ার জন্য ছুটির আবেদন করেন। তখন আজহারুল যাতে দেশের বাইরে পালাতে না পারেন, সে লক্ষ্যে দেশের সব বিমান, স্থল ও নৌবন্দরে চিঠি পাঠায় যুব মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে আজহারুল কবীর নিজের অপরাধ স্বীকার করে আত্মসাৎ করা প্রায় আড়াই কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। এরই মধ্যে এক কোটি টাকা ফেরত দিয়েছেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যোগসাজশকারী দুর্নীতিবাজরা ভেবেছিলেন, আড়াই কোটি টাকা ফেরত দিয়ে হয়তো তাঁরা পার পেয়ে যাবেন।

 

তবে তদন্তে প্রায় ১৪ কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য ধরা পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে আজহারুল কবীর গা-ঢাকা দেন। এ আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষক নুরুল আমিনের কাছে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইবাস++ এ আমার আইডি থেকে টাকা বরাদ্দ দেওয়া যায়। আমার বরাদ্দ অনুমোদন দেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আলী আশরাফ। উনি (আলী আশরাফ) আমার আইডির পাসওয়ার্ডও জানেন। তাই আমার আইডি থেকে কে বা কারা অবৈধভাবে টাকার বরাদ্দ দিয়েছেন, সেটা আমি জানি না। যেহেতু আমার বরাদ্দের অনুমোদনকারী আলী আশরাফ, তিনিই বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন। অধিদপ্তর-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুব উন্নয়নের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের অনুমোদন ছাড়া এমন দুর্নীতি সম্ভব নয়। কারণ আইবাস++ (সরকারের আর্থিক হিসাব সংক্রান্ত সফটওয়্যার)-এর মাধ্যমে সরকারের টাকা ছাড় হয়। এতে অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার অনুমোদন লাগে।

 

তবে তদন্তে সর্বোচ্চ উপপরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম এসেছে। এদিকে উল্লিখিত তদন্তের পর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মোস্তফা কামাল মজুমদারকে আহ্বায়ক করে এনএসপির সার্বিক আর্থিক কার্যক্রম মূল্যায়নে নতুন তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তবে জানতে চাইলে মোস্তফা কামাল তদন্তের কার্যক্রম নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। এদিকে ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি প্রকল্পের ২৯২ কোটি ১১ লাখ ৫১২ টাকা দুর্নীতি,অনিয়ম,সরকারী টাকা অপচয় ও আত্বসাতের ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব দেন এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের।

 

তারা সঠিক ভাবে তদন্ত না করে ভায়েস হয়ে ময়মনসিংহের সাবেক উপ-পরিচালক ফারজানা পারভিনসহ ৭ জনের পক্ষে প্রতিবেদন জমা দেন। এরপর থেকে তারা আলোচনায় আসেন। এরপর খায়রুল আলম রফিক নামের এক ব্যাক্তি ময়মনসিংহ জজ কোর্টে একটি অভিযোগ দায়ের করেন আদালতের বিচারক দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক ময়মনসিংহ জেলা শাখার ডিডিকে অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। যা অনুসন্ধান করছে দুদক। তথ্যসুত্র- দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..